আপনার প্রথম তিনমাসের নির্দেশিকা
-গর্ভাবস্থার প্রথম ১৩ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
অভিনন্দন - আপনি মা হতে চলেছেন! বাবা বা মা হওয়া একটি রোমাঞ্চকর এবং ফলপ্রসূ অভিজ্ঞতা। তবে মাঝে মাঝে এটিকে অপ্রতিরোধ্য মনে হতে পারে এবং আপনার মনে সম্ভবত অনেক ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে। এটা প্রত্যাশিত এবং গর্ভাবস্থায় এই নির্দেশিকাটি আপনার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগী হবে বলে আমরা মনে করি। গর্ভাবস্থার প্রথম ১৩ সপ্তাহ সময় আপনার শরীর ক্রমশঃ বাড়তে থাকবে এবং পরিবর্তিত হবে। ঠিক একইভাবে আপনার সন্তানের ক্ষেত্রেও এমনটি হবে। আপনারা যেহেতু একসাথে এই আশ্চর্যজনক যাত্রা শুরু করেছেন, সেহেতু যেসব বিষয় আপনাকে জানতে হবে সেগুলো এখানে রয়েছে।
আপনি কেমন বোধ করছেন?
আপনার শরীরের ভেতরে নতুন একটি জীবন বেড়ে ওঠার সাথে সাথে আপনার শরীরে বড় ধরনের কিছু পরিবর্তন ঘটতে চলেছে।
বমি-বমি ভাব বা ক্লান্তির মতো উপসর্গগুলো আপনি অনুভব করা শুরু করতে পারেন – বা আপনার শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে এমনটিও আপনি অনুভব করতে পারেন! আপনার শরীরের ভাষা শুনুন এবং প্রয়োজন অনুসারে আপনার রুটিন পরিবর্তন করুন। প্রতিটি নারী যেমন আলাদা, একই ভাবে প্রতিটি গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতাও আলাদা।
গর্ভাবস্থার প্রাথমিক লক্ষণ এবং উপসর্গসমূহ
নিয়মিত ঋতুচক্র (মাসিক) হয় এমন নারীদের জন্য ঋতুচক্র (মাসিক) হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া হ’ল গর্ভাবস্থার প্রথম লক্ষণ ।কখনও কখনও রক্তস্রাব হতে পারে। এতে হাল্কা ঋতুচক্র (মাসিক) বা দাগ কাটার মতো রক্ত দেখা যায়। তবে এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আপনি যদি গর্ভাবস্থায় এমন রক্তস্রাব দেখতে পান, তবে আপনার অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ক্লান্তি, বমি-বমি ভাব বা ঘন ঘন প্রস্রাবের মতো নিচের কিছু লক্ষণ আপনার ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে।
সাধারণ লক্ষণ:
গর্ভাবস্থার প্রথম দিকের সপ্তাহগুলোতে হরমোনের পরিবর্তন আপনার পুরো শরীরকে প্রভাবিত করবে। যদিও দুটি গর্ভাবস্থা কখনই একরকম নয়, তবে প্রথম তিন মাস আপনি কিছু লক্ষণ অনুভব করতে পারেন। লক্ষণগুলো নিম্নরূপ:
- স্তন নরম হয়ে যাওয়া
- মেজাজে চরম পরিবর্তন হওয়া
- বমি-বমি ভাব বা বমি (প্রভাতকালীন অসুস্থতা)
- ঘন মূত্রত্যাগ
- ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস পাওয়া
- চরম ক্লান্তি বোধ হওয়া
- মাথাব্যথা করা
- বুকজ্বালা করা
- পায়ে খিল ধরা
- পিঠের নিচের অংশ এবং শ্রোণীতে ব্যথা হওয়া
- নির্দিষ্ট কিছু খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়া
- নির্দিষ্ট কিছু খাবারের প্রতি নতুন করে অপছন্দ তৈরি হওয়া
- কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া
নিজের যত্ন নেয়া
গর্ভাবস্থার শুরুর দিকের লক্ষণগুলো, বিশেষ করে বলতে গেলে, অস্বস্তিকর হতে পারে। কিছুটা স্বস্তির জন্য, প্রথমে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে যাচাই করার পরে এই কৌশলটি ব্যবহার করে দেখুন। মনে রাখবেন, অগ্রাধিকার এবং হাতের কাছে যে জিনিসগুলো সহজলভ্য আপনার সিদ্ধান্তটি সবসময় তার ভিত্তিতেই নেয়া উচিত।
- বমি-বমি ভাব বা বমির ক্ষেত্রে আদা, কেমোমিল, ভিটামিন বি৬ এবং/বা আকুপাংচার করার চেষ্টা করুন।
- পায়ে খিল ধরার ক্ষেত্রে ম্যাগনেসিয়াম বা ক্যালসিয়াম নিয়ে দেখতে পারেন।
- কোষ্ঠকাঠিন্যের ক্ষেত্রে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ অনুসারে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এনেও যদি কাজ না হয়, সেক্ষেত্রে স্বস্তি পেতে গমের তুষ বা অন্যান্য ফাইবার জাতীয় সম্পূরক খাদ্যের ব্যবহার করা যেতে পারে।
আপনার পুরো গর্ভাবস্থার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিয়মিত অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ আপনি এটি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, ততক্ষণই আপনার দৈনিক শারীরিক কার্যক্রম চালিয়ে যান। গর্ভাবস্থায় আপনি যত বেশি সক্রিয় থাকবেন, আপনার পরিবর্তিত শরীরের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়া ততটাই সহজ হবে। পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে আপনার এবং আপনার সন্তানের ক্রমবর্ধমান শরীরের পুষ্টির বিষয়টি নিশ্চিত করুন। শাকসবজি, মাংস, শিম, বাদাম, পাস্তুরিক্রিত দুধ এবং ফলমূল সহ বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের মাধ্যমে আপনি যে পর্যাপ্ত শক্তি, আমিষ, ভিটামিন এবং খনিজ পাচ্ছেন তা নিশ্চিত করুন।
আপনার সন্তানের বৃদ্ধি ঘটছে কীভাবে?
এই সময়টি আপনার সন্তানের বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম তিন মাসে আপনার সন্তানের শরীর আকার নিতে শুরু করে। এসব প্রাথমিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং শারীরিক বিকাশের মধ্যে রয়েছে:
- মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ড
- কানের ভেতরের অংশ
- কার্ডিয়াক টিস্যু
- যৌনাঙ্গ
- আঙ্গুলের নখ
- যকৃৎ
- চোখের পাতা
- অগ্ন্যাশয়
- কিডনি
- হাত, পা এবং অন্যান্য অঙ্গগুলোর জন্য কার্টিলেজ
- মুখ, চোখ এবং নাকের পেশী
- আঙুল এবং পায়ের আঙ্গুল
- শ্বাসতন্ত্র
ভ্রূণের বৃদ্ধি বিভিন্ন কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে প্রথম তিনমাসের সময়, প্রথম মাসের শেষে আপনার সন্তান প্রায় ০.৬৪ সেন্টিমিটার (০.২৫ ইঞ্চি) [(চালের দানার চেয়ে ছোট)] লম্বা হবে এবং ১২ সপ্তাহের শেষে এটি বেড়ে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার (৪ ইঞ্চি) হবে ও ওজন হবে ২৮ গ্রাম [ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক থেকে প্রাপ্ত তথ্য]। আপনার নিজ দেশের তথ্যের জন্য, অনুগ্রহ করে আপনার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিন।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে আমার কখন দেখা করা উচিত?
যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে দেখা করা উচিত। তবে, গর্ভাবস্থার প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে কমপক্ষে একবার দেখা করার জন্য সময় নির্ধারণ করা উচিত। আপনার নিজ দেশে পরামর্শের জন্য, অনুগ্রহ করে আপনার দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে যোগাযোগ করুন।
যেসব বিষয়ে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে
যেহেতু প্রত্যেক নারীর গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা ভিন্ন, সেহেতু নিচের অভিজ্ঞতাগুলোর সামনাসামনি হলে আপনাকে অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে কথা বলতে হবে:
- মারাত্মক খিল ধরা
- ৩৮ (১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপরে জ্বর
- দুর্গন্ধযুক্ত যোনি স্রাব
- প্রস্রাবে যন্ত্রণা
- যোনিপথে রক্ত বের হওয়া
- মারাত্মক বমি-বমি ভাব
আপনার দ্বিতীয় তিনমাসের নির্দেশিকা
আপনার গর্ভাবস্থার ১৩ সপ্তাহ থেকে ২৮ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
আপনার দ্বিতীয় তিনমাসকে স্বাগতম! অনেক মহিলা দেখতে পান যে তাদের প্রথম তিনমাসের তুলনায় তাদের কম লক্ষণ রয়েছে। আপনার গর্ভাবস্থার সময়ে, আপনার গর্ভাশয় উপরের দিকে এবং বাইরের দিকে বাড়ার সাথে সাথে আপনি একটি ছোট বেবি বাম্প দেখতে শুরু করতে পারেন।
আপনি কেমন বোধ করছেন?
প্রত্যেক নারীই আলাদা। তবে সন্তান-সম্ভবা মায়েদের মধ্যে অনেকেই প্রথম তিনমাসের চেয়ে দ্বিতীয় তিনমাসের সময়টা ভাল অনুভব করেন। আশা করা যায় যে, এই সময়টাতে আপনি কম বমি-বমি ভাব এবং কম ক্লান্তি বোধ করবেন।
এ সময়টাতে আপনি পেট স্ফীত হয়ে যাওয়ার মতো আরও কিছু নতুন পরিবর্তনের সন্মুখিন হতে শুরু করবেন। এবং তৃতীয় তিনমাসে প্রবেশের সময় আপনার সন্তান নড়াচড়া করছে এবং আপনাকে লাথি মারছে - আপনার এমন অনুভূতি শুরু হওয়া উচিত!
সাধারণ লক্ষণ:
যদিও দুটি গর্ভাবস্থা কখনই একরকম নয়, তবে দ্বিতীয় তিনমাসের সময় আপনি কিছু লক্ষণ অনুভব করতে পারেন। লক্ষণগুলো নিম্নরূপ:
- হাত এবং আঙ্গুলের যন্ত্রণা - আপনার হাত অবশ হয়ে যাওয়া, অস্বস্তি হওয়া বা এমন অনুভব করা
- ত্বকের একটি রেখা আপনার নাভি থেকে যৌন কেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া
- আপনার মুখে গাঢ় ছোপ ছোপ দাগ পড়া
- পিঠের নিচের অংশ এবং শ্রোণীতে ব্যথা হওয়া
- স্তনবৃত্ত কালো হয়ে যাওয়া
- আপনার স্তন, পেট, নিতম্ব এবং উরুতে প্রসারিত দাগ পড়ে যাওয়া।
নিজের যত্ন নেয়া
দ্বিতীয় তিনমাসের সময় যদিও আপনার লক্ষণগুলো অনেকটা কমে আসা উচিত, তবে আপনি আপনার শরীরে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করতে শুরু করবেন। এই পরিবর্তনগুলোর সাথে আসতে পারে এমন কিছু ব্যথা এবং যন্ত্রণা যা সামলাতে আপনি প্রথমে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে যাচাই করে নিয়ে নিচের কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখুন। মনে রাখবেন, অগ্রাধিকার এবং হাতের কাছে যে জিনিসগুলো সহজলভ্য আপনার সিদ্ধান্ত সবসময় তার ভিত্তিতেই নেয়া উচিত।
- পিঠের নিচের অংশ এবং শ্রোণীতে ব্যথার ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ব্যায়াম করার পরামর্শ দেওয়া হয়। চিকিৎসার অনেকগুলো বিকল্প রয়েছে যা পাশাপাশি ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো হলো, ফিজিওথেরাপি, বেল্ট ব্যবহার এবং আকুপাংচার।
- হাত এবং আঙ্গুলের যন্ত্রণার মতো লক্ষণের ক্ষেত্রে বিশ্রাম, বরফ চাপা এবং আপনার হাত এবং কব্জি উপরে তোলা।
- প্রসারিত দাগ পড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যদি আপনি কোনও ক্রিম, জেল বা লোশন ব্যবহার করতে চান, তবে প্রথম দিকেই এটি করা শুরু করুন এবং যেখানে দাগ হয়েছে এমন স্থানে এসব পণ্য মালিশ করুন। একটানা কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন নির্বাচিত পণ্যটি ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
- দ্বিতীয় তিনমাস এমনকি পুরো গর্ভাবস্থার সময়টাতেই স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নিয়মিত শারীরিক অনুশীলনের রুটিন বজায় রাখুন। তবে নিজেকে কখনোই ক্লান্ত করবেন না। একটি সাধারণ নিয়ম হিসাবে, কাজ করার সময় কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আপনার থাকা উচিত। গর্ভাবস্থায় শারীরিক অনুশীলন সম্পর্কে সবসময় আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করুন। পর্যাপ্ত শক্তি, আমিষ, ভিটামিন এবং খনিজ জাতীয় খাদ্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরণের খাবার খাওয়া উচিত।
আপনার সন্তানের বৃদ্ধি ঘটছে কীভাবে?
দ্বিতীয় তিনমাসে আপনার সন্তানের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো এবং শরীর আরও পরিশীলিতভাবে বিকশিত হতে থাকে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সপ্তাহগুলোতে যা হয় সেগুলো নিম্নরূপ:
- হাড় শক্ত হতে শুরু হয়
- ত্বক ঘন হতে শুরু হয়
- পায়ের গোড়ালি গঠিত হয়
- স্নায়ুতন্ত্র বিকশিত হতে শুরু হয়
- শ্রবণশক্তি বিকশিত হতে শুরু হয়
- মস্তিষ্কের এমন অংশের বিকাশ ঘটতে শুরু করে যা শারীরিক নড়াচড়া কিংবা চালচলনকে প্রভাবিত করে
- চোখের পাতা খুলতে এবং বন্ধ করতে পারে
- লাথি জোরালো হতে পারে
- হজম ব্যবস্থা কাজ করতে শুরু করে
- ফুসফুস সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয়
ভ্রূণের বৃদ্ধি বিভিন্ন কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে দ্বিতীয় তিনমাসের শুরুতে আপনার সন্তান প্রায় ১০ সেন্টিমিটার (৪ ইঞ্চি) লম্বা হয় এবং তার ওজন প্রায় ২৮ গ্রাম হয়। দ্বিতীয় তিনমাস শেষ হওয়ার পরে, আপনার বেড়ে ওঠা সন্তানটি প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার (১৪ ইঞ্চি) লম্বা হবে এবং তার ওজন ১ থেকে ২ কেজি (২ থেকে ৪ পাউন্ড) হবে। [ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক থেকে প্রাপ্ত তথ্য]। আপনার নিজ দেশের তথ্যের জন্য, অনুগ্রহ করে আপনার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিন।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে আমার কখন দেখা করা উচিত?
দ্বিতীয় তিনমাসের সময়, ২০ সপ্তাহের সময় একবার এবং ২৬ সপ্তাহের সময় আরেকবার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে আপনার সাক্ষাৎ করা উচিত। আপনার নিজ দেশের তথ্যের জন্য, অনুগ্রহ করে আপনার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিন।
যেহেতু প্রত্যেক নারীর গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা ভিন্ন, সেহেতু নিচের অভিজ্ঞতাগুলোর সামনাসামনি হলে আপনাকে অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে কথা বলতে হবে:
- মারাত্মক খিল ধরা বা পেটে ব্যথা
- ৩৮ (১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের উপরে জ্বর
- যোনিপথে রক্ত বা তরল বের হওয়া
- হঠাৎ বা মারাত্মক ফোলাভাব
- দুর্গন্ধযুক্ত যোনি স্রাব
- প্রস্রাবে যন্ত্রণা
- মারাত্মক এবং অবিরাম মাথাব্যথা
- রক্ত বমি করা
- শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত সমস্যা
- হৃদপিণ্ডের ধড়ফড়ানি
- ঝাপসা দৃষ্টি
আপনার তৃতীয় তিনমাসের নির্দেশিকা
আপনার গর্ভাবস্থার ২৯ সপ্তাহ থেকে ৪০ সপ্তাহের জন্য পরামর্শ
অভিনন্দন, আপনি প্রায় বাড়ির দোঁড়গোড়ায় পৌঁছে গেছেন! আপনি শীঘ্রই আপনার পরিবারে একজন সুন্দর নতুন সদস্যকে স্বাগত জানাবেন। এই শেষ সপ্তাহগুলোতে আপনি আরও ক্লান্ত এবং অস্বস্তি বোধ করছেন, তবে আপনার জন্য সামনে তাকানোর অনেক কিছুই রয়েছে!
আপনি কেমন বোধ করছেন?
দ্বিতীয় তিনমাসের সময় আপনি যেসব সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, ঠিক একই রকম সমস্যা তৃতীয় তিনমাসেও অব্যাহত থাকবে। এছাড়াও, অনেক সন্তান-সম্ভবা মায়ের শ্বাস নিতে অসুবিধা হয় এবং তাদের আরও বেশি বাথরুমে যেতে হয়। কারণ আপনার সন্তান বড় হচ্ছে এবং আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোতে সে আরও চাপ দিচ্ছে। এতে করে উদ্বিগ্ন হবার কিছু নেই। আপনার সন্তান ভাল আছে এবং এই সমস্যাগুলো আপনার সন্তানের জন্মের পরে কমে যাবে।
সাধারণ লক্ষণ:
যদিও দুটি গর্ভাবস্থা একরকম হয় না, তবে তৃতীয় তিনমাসের সময় আপনি কিছু লক্ষণ অনুভব করতে পারেন। লক্ষণগুলো নিম্নরূপ:
- বুকজ্বালা
- রক্তক্ষরণ
- শ্বাস-প্রশ্বাস জনিত সমস্যা
- স্তন নরম হয়ে যাওয়া
- নাভি ছড়িয়ে যাওয়া
- ঘুমের সমস্যা
- আঙ্গুল, মুখ এবং গোড়ালি ফুলে ওঠা
নিজের যত্ন নেয়া
আপনার সন্তানটি যেহেতু পরিপূণ মেয়াদে পৌঁছেছে, সে কারনে দ্বিতীয় তিনমাসের তুলনায় তৃতীয় তিনমাসে আপনি বেশি অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। এসব অস্বস্তিগুলো সামলাতে প্রথমে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করে নিচের কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। মনে রাখবেন, অগ্রাধিকার এবং হাতের কাছে সহজলভ্য যে জিনিসগুলো রয়েছে আপনার সিদ্ধান্ত সবসময় তার ভিত্তিতে নেয়া উচিত।
বুকজ্বালার ক্ষেত্রে খাদ্যাভাস এবং জীবন চর্চায় পরিবর্তন সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জিজ্ঞাসা করুন। এগুলোর ফলে যদি কোনো উপকার না হয়, কষ্টদায়ক লক্ষণগুলোর জন্য অ্যান্টাসিড জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঘুমের সমস্যার ক্ষেত্রে আপনার পুরো শরীরকে বা বিশ্রাম নেওয়ার সময় উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করে কেবল এমন নির্দিষ্ট জায়গার জন্য বালিশ ব্যবহার করার চেষ্টা করুন।
তৃতীয় তিনমাস এমনকি গর্ভাবস্থার পুরো সময়টাতেই স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনার নিয়মিত শারীরিক অনুশীলনের রুটিন বজায় রাখুন। তবে নিজেকে কখনোই ক্লান্ত করবেন না। একটি সাধারণ নিয়ম হিসাবে, কাজ করার সময় কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা আপনার থাকা উচিত। গর্ভাবস্থায় শারীরিক অনুশীলন সম্পর্কে সবসময় আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে পরামর্শ করুন। পর্যাপ্ত শক্তি, আমিষ, ভিটামিন এবং খনিজ জাতীয় খাদ্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ধরণের খাবার খাওয়া উচিত।
ব্র্যাক্সটন হিক্স (মিথ্যা প্রসব বেদনা)
তৃতীয় তিনমাসের সময় কখনো কখনো ব্যথা অনুভব করতে পারেন। এই ব্যথা সত্য বা মিথ্যা প্রসবের লক্ষণ হতে পারে। “মিথ্যা প্রসব” ব্যথাকে ব্র্যাকটন হিক্স বলা হয় এবং এটি আপনার শরীরকে আসল প্রসবের জন্য প্রস্তুত করার একটি উপায়। এতে তাদের ঋতুস্রাব বা পেট শক্ত হওয়ার মতো অনুরূপ অনুভূতি হতে পারে।
ব্র্যাকটন হিক্সের কোনও চিকিৎসা নাই। তবে অস্বস্তি কমানোর জন্য আপনি কিছু জিনিস করতে পারেন। এগুলো নিম্নরূপ:
- পানি পান করা
- আপনার শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন করা (যদি আপনি শুয়ে থাকেন তবে হাঁটার চেষ্টা করুন এবং এর বিপরীতটাও করুন)
- একটু ঘুমিয়ে নিয়ে, একটি বই পড়ে বা শান্ত সংগীত শুনে স্বস্তি বোধ করা।
এগুলোর পরেও যদি ব্যথা না কমে এবং আপনি যদি আরও ঘন ঘন বা তীব্র ব্যথা অনুভব করেন, তাহলে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।
প্রসবের জন্য যাওয়া
বেশিরভাগ মায়েরা গর্ভাবস্থার ৩৮ থেকে ৪১ সপ্তাহের মধ্যে সন্তান জন্ম দেয়। তবে আপনি কখন সন্তান প্রসব করবেন তার একেবারে সঠিক সময়টি জানার কোনও উপায় নেই।
যখন ব্যথা শুরু হয়, জরায়ু প্রসারিত হতে থাকে ও জরায়ুর পেশী নিয়মিত বিরতিতে সংকোচন হতে শুরু করে এবং সময়ের সাথে সাথে এরা আরও কাছাকাছি আসে। সংকোচনের কারণে ঋতুস্রাবের মতো বোধ হয়। তবে এটি আরও তীব্র হয়। আপনার জরায়ু যেহেতু সংকুচিত হয়, আপনি আপনার পিঠে বা শ্রোণীতে ব্যথা অনুভব করতে পারেন এবং আপনার পেট শক্ত হয়ে যেতে পারে। জরায়ু প্রসারিত হয়ে গেলে আপনার পেট আবার নরম হয়ে যাবে।
সংকোচনের পাশাপাশি ব্যথা শুরু হওয়ার আরও কয়েকটি লক্ষণ রয়েছে। এগুলো নিম্নরূপ:
- হাল্কাবোধ করা (আপনার ভ্রূণ ক্রমেই নিচের দিকে নামছে এমন অনুভূতি)
- শ্লেষ্মা গ্লাগের ক্ষতি (আপনি গোলাপী স্রাবের বৃদ্ধি লক্ষ্য করবেন)
- পানি ভাঙ্গা (ঝিল্লি ফেটে যাওয়া।
এটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রসব ব্যথা শুরুর আগে এই পরিবর্তনগুলোর কয়েকটি আপনি লক্ষ্য নাও করতে পারেন। আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার প্রসব হবে তবে আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে যোগাযোগ করুন।
আপনার সন্তানের বৃদ্ধি ঘটছে কীভাবে?
বিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে আপনার সন্তান গর্ভাশয় ছাড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তৃতীয় তিনমাস এবং জন্মের শুরুর মাঝখানে যে জিনিসগুলো হয় সেগুলো নিম্নরূপ:
- চোখ আলোর পরিবর্তন বুঝতে পারে
- মাথায় কিছু চুল গজাতে পারে
- লাথি মারতে, ধরতে ও শরীর প্রসারিত করতে পারে
- অঙ্গগুলো পুষ্ট ও গোলাকার হতে শুরু করে
- হাড় শক্ত হতে শুরু করে
- সংবহনতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে গঠিত হয়
- পেশীগুলো সম্পূর্ণভাবে গঠিত হয়
- ফুসফুস, মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ঘটে
- অবিরতভাবে চর্বি যুক্ত হতে থাকে।
ভ্রূণের বৃদ্ধি বিভিন্ন কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। তবে তৃতীয় তিনমাসের শুরুতে আপনার সন্তান প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার (১৪ ইঞ্চি) লম্বা হয় এবং তার ওজন প্রায় ১ থেকে ২ কেজি (২ থেকে ৪ পাউন্ড) হয়। যখন আপনি প্রসব করবেন, আপনার নবজাতক প্রায় ৪৬ থেকে ৫১ সেন্টিমিটার লম্বা হবে (১৮ থেকে ২০ ইঞ্চি) এবং তার ওজন ৩ কেজির বেশি হবে (৭ পাউন্ড) [ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক থেকে প্রাপ্ত তথ্য]। আপনার নিজ দেশের তথ্যের জন্য, অনুগ্রহ করে আপনার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিন।
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে আমার কখন দেখা করা উচিত?
আপনার তৃতীয় তিনমাসের সময়, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সাথে আপনার ৫ বার সাক্ষাৎ করা উচিত। এগুলো ৩০ সপ্তাহে, ৩৪ সপ্তাহে, ৩৬ সপ্তাহে, ৩৮ সপ্তাহে এবং ৪০ সপ্তাহে। আপনার নিজ দেশের পরামর্শের জন্য, অনুগ্রহ করে আপনার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিন।
যেসব বিষয়ে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে
যেহেতু প্রত্যেক নারীর গর্ভাবস্থার অভিজ্ঞতা ভিন্ন, সেহেতু নিচের অভিজ্ঞতাগুলোর সামনাসামনি হলে আপনাকে অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সাথে কথা বলতে হবে:
- ভারি রক্তক্ষরণ
- মাথাব্যথার পাশাপাশি দাগ বা ফ্ল্যাশিং লাইট যা যায়না
- হঠাৎ বা মারাত্মক ফোলাভাব
- ভ্রূণের নড়াচড়া হ্রাস পাওয়া (আপনার সন্তানের প্রতিদিন নড়াচড়া করা উচিত)
- আপনার পানি ভেঙে গেছে এবং আপনার ব্যথার সমস্যা নেই
- সংকোচনের মধ্যে ক্রমাগত ব্যথা।
গর্ভাবস্থায় কী খেতে হবে?
গর্ভে বড় হতে থাকা সন্তানের পুষ্টির জন্য যা করতে হবে
মা হতে চলেছেন, এজন্য আপনাকে অভিনন্দন! অনাগত সন্তান নিয়ে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে মনে অনেক প্রশ্নও আসছে। তার মধ্যে একটি বিষয় সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তা হলো: আমার কী খাওয়া উচিত?
জীবনের সব পর্যায়েই স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গর্ভাবস্থায় এটা বিশেষভাবে জরুরি। সুষম খাবার আপনার সন্তানের বেড়ে ওঠা, তার বিকশিত হওয়া এবং সঠিক ওজন বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
পরিবারের নতুন সদস্যের কল্যাণের জন্য কীভাবে আপনার খাবার তালিকায় পরিবর্তন আনবেন, তা জানতে আমাদের টিপসগুলো দেখুন।
গর্ভধারণকালে সুষম খাবারের তালিকা কীভাবে অনুসরণ করব?
একটি পুষ্টিকর খাবার তালিকা তখনই নিশ্চিত হয় যখন মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় সবগুলো খাদ্য উপাদানযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার প্রতিদিনের খাবার তালিকায় থাকে।
- ফলমূল- টাটকা, হিমায়িত ও শুকনো সব ফলই ভালো। খাবারের সময় আপনার প্লেটের অর্ধেক থাকা উচিত ফলমূল ও সবজি।
- শাকসবজি- টাটকা, ক্যানে সংরক্ষণ করা, হিমায়িত বা শুকিয়ে সংরক্ষণ করা শাকসবজি- এগুলোর যে কোনোটি আপনি খেতে পারেন। সালাদের জন্য পাতাওয়ালা গাঢ় সবুজ শাকসবজি পুষ্টিকর। খাবারের সময় আপনার প্লেটের অর্ধেক থাকবে ফলমূল ও সবজি।
- গ্রেইনস বা শস্য- আপনাকে খাবারের প্লেটে যে সব শস্য দেওয়া হবে, তার অর্ধেকটা ‘হোল গ্রেইন’ হতে হবে। হোল গ্রেইন হলো সেই সব খাবার যেগুলো প্রক্রিয়াজাত নয় এবং খাদ্যশস্যের পুরোটা থেকে আসা যেমন- ওটস, বার্লি, কুইনোয়া (কাওনের চাল), ব্রাউন রাইস (ঢেঁকিছাঁটা চাল) ও লাল আটা।
- আমিষ- প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের আমিষযুক্ত খাবার রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মাংস, পোল্ট্রি, শিম, মটরশুঁটি, ডিম, বাদাম ও বীজ জাতীয় খাবার- এগুলোর সবই আমিষসৃমদ্ধ খাবার।
- ডেইরি- ডেইরি পণ্য বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অবশ্যই দেখে নিতে হবে সেগুলো যেন পাস্তুরিত হয়। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য যেমন পনির, দই এগুলো ভালো খাবার।
- তেল ও ফ্যাট (স্নেহ)- স্নেহজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রে প্রাণিজ ফ্যাট খাওয়াটা সীমিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট অন্যান্য খাবারে পাওয়া যায় যেমন, কিছু মাছ, অ্যাভোকোডো ও বাদাম। খাবারে তেল আসে মূলত উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে (যেমন অলিভ ওয়েল ও ক্যানোলা ওয়েল)।
গর্ভাবস্থায় কোন কোন ভিটামিন ও খনিজ দরকার?
আপনার গর্ভধারণের শুরু থেকেই যেসব ভিটামিন ও খনিজ খাদ্য উপাদান প্রয়োজন সেগুলো তুলে ধরা হল:
- ক্যালসিয়াম- আপনার সন্তানের দাঁত ও হাড় গঠনের জন্য ক্যালসিয়াম গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য প্রতিদিন ১ হাজার মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করতে হবে। দই, দুধ, পনির, পাতাযুক্ত গাঢ় সবুজ শাকসবজি ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস।
- আয়রন- প্রতিদিন ২৭ মিলিগ্রাম আয়রন গ্রহণের চেষ্টা করুন। আয়রন আপনার শরীরের লোহিত রক্ত কণিকাকে গর্ভে বাড়তে থাকা সন্তানকে অক্সিজেন সরবরাহে সহায়তা করবে। আপনি এটা পাবেন চর্বিহীন মাংস (রেড মিট), পোল্ট্রি, মটরশুঁটি ও শিমে।
- আয়োডিন- আপনার সন্তানের মস্তিষ্কের যথাযথ বিকাশের জন্য প্রতিদিন ২২০ মাইক্রোগ্রাম আয়োডিন প্রয়োজন। আপনি আয়োডিন পাবেন ডেইরি পণ্য, সামুদ্রিক খাবার, মাংস ও ডিমে।
- কোলিন- আপনার গর্ভের ভ্রুণের মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ড বিকাশে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান কোলিন। গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন আপনাকে এটা ৪৫০ মিলিগ্রাম করে গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য দুধ, ডিম, বাদাম ও সয়া পণ্য খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে।
- ভিটামিন ‘এ’- গাজর, মিষ্টি আলু এবং সবুজ পাতাওয়ালা শাকসবজি- এগুলোর সবকিছুতেই ভিটামিন ‘এ’ থাকে। ভিটামিন ‘এ’ আপনার সন্তানের হাড়ের বেড়ে ওঠা, দৃষ্টিশক্তি তৈরি ও ত্বকের বিকাশের জন্য প্রয়োজন। প্রতিদিন আপনাকে ৭৭০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ‘এ’ গ্রহণ করতে হবে।
- ভিটামিন ‘সি’- গর্ভের সন্তানের মাড়ি, দাঁত ও হাড়ের বিকাশের জন্য প্রতিদিন আপনার ৮৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘সি’ গ্রহণ করতে হবে। লেবু, কমলা, জাম্বুরার মতো বিভিন্ন সাইট্রাস ফল, ব্রোকলি, টমেটো ও স্ট্রবেরিতে ভিটামিন ‘সি’ থাকে।
- ভিটামিন ‘ডি’- সূর্যের আলো, ফোরটিফাইড মিল্ক (এক্সট্রা ভিটামিন ও খনিজ যুক্ত দুধ), স্যামন ও সার্ডিনের মতো চর্বিসমৃদ্ধ মাছ- এগুলো আপনাকে প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ৬০০ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট ভিটামিন ‘ডি’ পেতে সহায়তা করবে। ভিটামিন ‘ডি’ আপনার শিশুর হাড় ও দাঁত গঠন এবং ভালো দৃষ্টিশক্তি ও ত্বকের বিকাশে সহায়তা করবে।
- ভিটামিন ‘বি৬’- ভিটামিন ‘বি৬’ আপনার শিশুর লোহিত রক্ত কণিকা তৈরিতে সহায়তা করবে। প্রতিদিন আপনাকে ১.৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন ‘বি৬’ গ্রহণ করতে হবে। গরুর মাংস, শূকরের মাংস, হোল গ্রেইন সিরিল ও কলা ভিটামিন ‘বি৬’ এর ভালো উৎস।
- ভিটামিন ‘বি১২’- আপনার গর্ভের সন্তানের স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ এবং লোহিত রক্ত কণিকা তৈরিতে ভিটামিন ‘বি১২’ গুরুত্বপূর্ণ। মাছ, মাংস, পোল্ট্রি ও দুধ ভিটামিন ‘বি১২’ এর উৎস। প্রতিদিন আপনাকে ২.৬ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ‘বি১২’ গ্রহণ করতে হবে।
- ফলিক এসিড- গর্ভবতী মায়েদের জন্য ফলিক এসিড বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই বি ভিটামিন শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের জন্মগত ত্রুটি এড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং এটা ভ্রুণ ও প্ল্যাসেন্টার বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করে। বাদাম, গাঢ় সবুজ পাতাওয়ালা শাকসবজি, শিম ও কমলা লেবুর রস প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ৬০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড পেতে সহায়তা করবে। যদিও এই পরিমাণ ফলিক এসিডের চাহিদা পূরণের জন্য শুধু খাবার যথেষ্ট নয়।
যথেষ্ট পরিমাণে ফলিক এসিড প্রাপ্তি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়?
শুধু খাবার থেকে দৈনিক ৬০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড পাওয়াটা কঠিন হওয়ায় আপনি প্রতিদিন সম্পূরক হিসেবে অন্তত ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক এসিড সেবন করতে পারেন। তাতে আপনার প্রয়োজনটা পূরণ হবে। আপনি সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করার সময় থেকেই বা গর্ভধারণ নিশ্চিত হলেই এটা নেওয়া শুরু করতে পারেন। আপনার জন্য কোন সম্পূরকটি উপযুক্ত, সেটা বোঝার জন্য আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
গর্ভাবস্থায় কোন কোন খাবার এড়িয়ে চলা উচিত?
গর্ভবতী মায়েদের নির্দিষ্ট কিছু খাবার থেকে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর তা গর্ভধারণ সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি করতে পারে। গর্ভধারণকালে আপনাকে যেসব খাবার এড়িয়ে চলতে হবে:
- কাঁচা, পাস্তুরায়ন ছাড়া দুধ এবং ওই ধরনের দুধ থেকে তৈরি কোমল পনির। এগুলোতে লিসটেরিয়া নামের এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা লিসটেরিওসিস নামের এক ধরনের রোগ তৈরি করতে পারে।
- মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার। কারণ সেগুলোতে ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- কাঁচা ও পুরোপুরি রান্না না হওয়া মাংসজাত পণ্য যেমন সসেজ ও কোল্ড কাট। এগুলোতে টোকসোপ্ল্যাজমা গনডির মতো পরজীবী এবং সালমোনিলা ও লিসটেরিয়ার মতো ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- কাঁচা মাছ ও সিফুড। কারণ এগুলোতে উচ্চমাত্রায় ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী থাকতে পারে।
- কিছু মাছে উচ্চ মাত্রায় পারদ (মার্কারি) থাকে এবং এগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। বেশির ভাগ শিকারি মাছ যেমন হাঙ্গর, সোর্ড ফিশ, মার্লিন ও কিং ম্যাককেরেলে মার্কারি বেশি থাকে।
- রান্না না করা অঙ্কুরিত বীজ, খাদ্যশস্য ও শিম। কাঁচা মূলা, শিম ও আলফালফার বীজ এবং রেডি-টু-ইট সালাদ এসব খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ এগুলোতে লিসটেরিয়া, সালমোনিলা ও ই. কোলির মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- কাঁচা বা কম সিদ্ধ ডিম। এতে সালমোনিলা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
- যকৃত (লিভার) ও অন্যান্য অঙ্গের মাংস। যকৃতে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকলেও এটা গর্ভধারিণী নারীদের খেতে বলা হয় না। কারণ এতে উচ্চমাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ থাকে এবং এই মাংসে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে।
গর্ভবতী মার জন্য কীভাবে নিরাপদে খাবার প্রস্তুত করা যায়?
- খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
- ব্যবহারের পর সব পাত্র ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
- মাংস পুরোপুরি রান্না করতে হবে।
- রান্না না করা শাকসবজি, সালাদের সবজি ও ফলমূল খুব সতর্কতার সঙ্গে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
- যথাযথ তাপমাত্রায় খাবার সংরক্ষণ করতে হবে।
- রান্নার পরপরই খাবার খেয়ে নিতে হবে।
গর্ভাবস্থায় কতটা বেশি খাওয়া দরকার?
প্রথম তিন মাসে আপনার কোনো বাড়তি খাবারের দরকার নেই। দ্বিতীয় তিন মাসে প্রতিদিন আপনার ৩৪০ ক্যালোরি বাড়তি দরকার হবে। আর শেষ তিন মাসে আপনার প্রতিদিন অতিরিক্ত ৪৫০ ক্যালোরি দরকার হবে। এই বাড়তি শক্তির জন্য হাতের কাছে স্বাস্থ্যকর হালকা খাবার যেমন বাদাম, দই ও তরতাজা ফলমূল রাখবেন। এ বিষয়ে উপযুক্ত পরিকল্পনা পেতে আপনার স্বাস্থ্য সেবাদাতার সঙ্গে কথা বলুন।
Fact source: UNICEF https://www.unicef.org/bangladesh/en/parenting-bd/your-first-trimester-guide
