ব্যাক পেইন শব্দটি আমরা আজকাল বেশ শুনতে পাই। এই ব্যাক পেইন বা পিঠ ব্যথা সাধারণত নিচের পিঠের পেশি, লিগামেন্ট, মেরুদণ্ড, কশেরুকার সমস্যা থেকে তৈরি হয়। পিঠ ব্যথার কারণগুলোর ভেতর সবচেয়ে বেশি থাকে পিঠের পেশিতে চাপ পড়া এবং পিঠের কাঠামোগত সমস্যা। চলুন জেনে নেওয়া যাক পিঠ ব্যথা বা ব্যাকপেইনের কারণগুলো কী কী।
- পিঠের পেশিতে চাপ বা স্ট্রেইন: পিঠের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ, ভারী বস্তু ভুলভাবে উত্তোলন এবং ভুল ভঙ্গিতে শরীরের আকস্মিক নড়াচড়াতে প্রায়ই পিঠে ব্যথা করে। অতিরিক্ত কাজ করার ফলেও পেশিতে চাপ পড়তে পারে।
- কাঠামোগত সমস্যা: কশেরুকা হলো মেরুদণ্ডকে ঘিরে থাকা চাকতি আকারের হাড়। এই হাড়গুলো একে অপরের সাথে সংযুক্ত। প্রতিটি কশেরুকার মধ্যবর্তী স্থানগুলোতে ডিস্ক নামক টিস্যু থাকে এবং কশেরুকাগুলোকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে। এই ডিস্কে আঘাত পিঠে ব্যথার সাধারণ কারণ। কখনো কখনো এই ডিস্কগুলো ফুলে যেতে পারে, বেরিয়ে পড়তে পারে (হার্নিয়েট হওয়া), অথবা ফেটে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডের স্নায়ুতে চাপ পড়ে। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে বেশি ব্যথা হয় হার্নিয়েটেড ডিস্ক বা ডিস্কগুলো কশেরুকা থেকে বেরিয়ে গেলে। বেরিয়ে পড়া ডিস্ক স্নায়ুতে চাপ দিলে পিঠ বা কোমর থেকে পা পর্যন্ত ব্যথা, শিরশিরে অনুভুতি এবং অল্প থেকে প্রচণ্ড পরিমাণ ব্যথা হতে পারে।
- বাত বা আর্থ্রাইটিস: স্পাইনাল অস্টিওআর্থারাইটিস পিঠে ব্যথার একটি সম্ভাব্য কারণ। এই রোগে আপনার পিঠের নিচের জয়েন্টগুলোর কারটিলেজের অবনতি ঘটে যার কারণে মেরুদণ্ড চেপে আসতে পারে বা সংকীর্ণ হতে পারে, যা ব্যথার কারণ।
- অস্টিওপোরোসিস: হাড়ের ঘনত্ব হ্রাস এবং হাড় পাতলা হয়ে যাওয়াকে অস্টিওপোরোসিস বলা হয়। এতে আপনার কশেরুকার ছোটো ছোটো ফাটল হতে পারে যেগুলো গুরুতর ব্যথার কারণ।
- পিঠে ব্যথার অন্যান্য কারণ:ওপরে দেওয়া কারণগুলোর বাইরেও আরো কিছু কারণেও আপনার ব্যাকপেইন বা পিঠে ব্যথা হতে পারে।
-ডিজেনারেটিভ স্পন্ডিলোলিস্থেসিস: একটি কশেরুকা তার স্থান থেকে সরে গিয়ে কাছাকাছি একটি কশেরুকার দিকে চলে যাওয়া।
-কাউডা ইকুইনা সিন্ড্রোম: মেরুদণ্ডের নিচের অংশে স্নায়ুর কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া।
-মেরুদণ্ডের ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ।
-মেরুদণ্ডে ক্যান্সার বা টিউমার।
– কিডনি সংক্রমণ বা কিডনি পাথর।
ব্যাকপেইন যন্ত্রণাদায়ক এবং এটি কাজের ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। তাই আপনি যদি অনেকদিন ধরে, ঘনঘন পিঠের ব্যথা অনুভব করেন তবে একজন ডাক্তারের সাথে দেখা করতে ভুলবেন না।
পিঠে ব্যাথা প্রতিরোধে ৯টি দৈনিক অভ্যাস
পিঠ ব্যথা প্রতিরোধে সবচেয়ে জরুরী হলো আপনার পিঠের উপর চাপ কমানো। তাই দৈনন্দিন চলাফেরা এবং কাজকর্মের সময় আপনার দেহভঙ্গীর দিকে খেয়াল রাখুন। কিছু কাজ আছে যেগুলিকে আপনার দৈনন্দিন জীবনে অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে পিঠে ব্যাথা বা ব্যাকপেইন থেকে সহজেই দূরে থাকা সম্ভব। চলুন এমন নয়টি অভ্যাস সম্পর্কে জেনে নিই।
- কম ওজন বহন করুন: ভারী ব্রিফকেস, ল্যাপটপ ব্যাগ, স্যুটকেস কিংবা বাজারের ব্যাগ- এগুলি আপনার ঘাড় এবং মেরুদণ্ডে অপ্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগ করতে পারে। তাই শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় জিনিসই বহন করুন। এমন ব্যাগ ব্যবহার করুন যা পিঠে, ঘাড়ে, কাঁধে সমানভাবে ভর বিতরণ করে, যেমন ব্যাকপ্যাক, যা দুই কাঁধে নেয়ার মত। ভারী কিছু বহন করতে চাইলে, প্রয়োজনে চাকাওয়ালা ব্যাগ ব্যবহার করুন।
- ব্যায়াম করুন: আপনার পেট এবং পিঠের চারপাশের পেশীগুলি আপনাকে সোজা থাকতে সাহায্য করে এবং পুরো শরীরের ভার বহন করতে সহায়তা করে। তাই এগুলিকে শক্তিশালী করে আপনার পিঠে ব্যথা বা ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে পারেন। সপ্তাহে অন্তত কয়েকবার পেট ও পিঠের ব্যায়াম করুন।
- সোজা হোন: সঠিক দেহভঙ্গী আপনার মেরুদন্ডকে সুস্থ রাখে এবং সঠিকভাবে কাজ করতে সহায়তা করে। দেহভঙ্গি সঠিক না হলে তা আপনার মেরুদন্ডে অপ্রয়োজনীয় চাপ প্রয়োগ করে। যারা দীর্ঘক্ষণ অফিসে কিংবা কম্পিউটারের সামনে কাজ করেন তাদের ব্যাকপেইন হবার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। তাই চেয়ারে বসার সময় সোজা হয়ে বসতে হবে। দাড়ানোর সময়ও সোজা হয়ে দাড়াতে হবে। ফোন ব্যবহারের সময় চেষ্টা করতে হবে যেন তা মাথা সোজা রেখে ব্যবহার করা হয়। কম্পিউটারের মনিটর প্রয়োজনে উচু করে নিতে হবে যেন মাথা ও শিরদাড়া সোজা রেখে কাজ করা যায়।
- টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়বেন না: অফিসের চেয়ারে বসার সময় কিংবা দাঁড়ানোর সময় ঝুঁকে যাবেন না। বিশেষ করে যদি আপনি প্রতিদিন কয়েক ঘন্টার বেশি বসে থাকেন বা ‘ডেস্ক জব’ করেন তাহলে ঠিকভাবে বসা এবং আপনার পিঠকে পেছন থেকে সঠিকভাবে চাপ দিয়ে রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। বসার চেয়ারটা ভাল হওয়া খুব জরুরী। এমন চেয়ার বেছে নিন যা আপনার পিঠের নীচের দিককে সঠিক ভাবে চাপ দিয়ে রাখতে পারবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন আপনি বসলে আপনার হাঁটু আপনার নিতম্বের থেকে একটু উঁচুতে থাকে।
- প্রায়ই নড়ে চড়ে বসুন, উঠুন: দীর্ঘ সময় ধরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা, বসা বা শুয়ে থাকা আপনার পিঠের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়। আপনি যখনই পারেন বসা থেকে উঠে, হাঁটাহাঁটি করে এবং কিছু সাধারণ হাল্কা স্ট্রেচ করে পেশী এবং হাড় এবং মেরদন্ডকে চাপ থেকে মুক্তি দিন। এটি আপনার পিঠে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয় এবং সুস্থ রাখে।
- জুতা বদলান: হাই-হিলের জুতা আপনার পিঠের ক্ষতির কারণ হতে পারে, বিশেষ করে তা যদি নিয়মিত পরেন। তাই অল্প উচ্চতার সমান তলিওয়ালা জুতা বা স্যান্ডেল ব্যবহার করুন।
- আপনার ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি গ্রহণের পরিমাণ বাড়ান: পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি গ্রহণ করে আপনার মেরুদন্ডের হাড় মজবুত রাখুন। ক্যালসিয়াম অস্টিওপরোসিস প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে, যা বিশেষ করে নারীদের পিঠে ব্যথার একটি বড় কারণ। দুধ, দই, শাকে আপনি পাবেন ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ডি পাবেন চর্বিযুক্ত মাছ, ডিমের কুসুম, গরুর যকৃত বা কলিজা কিংবা পনিরে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরণের ক্যালসিয়াম বড়ি পাওয়া যায় যা কার্যকত। তবে ভিটামিনের বড়ি খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে নিতে হবে।
- সিগারেটটা বাদ দিন: ধূমপান গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এবং এটি ব্যাকপেইনও বাড়িয়ে তুলতে পারে। নিকোটিন মেরুদন্ডের ডিস্কগুলিতে রক্ত প্রবাহকে সীমিত করে দেয়, যার ফলে তারা শুকিয়ে যায় বা ফেটে যেতে পারে। ধূমপান রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণও হ্রাস করে এবং এর ফলে পেশীতে কম পুষ্টি পৌঁছায়। এই দুর্বল, অসুস্থ পিঠ দুর্ঘটনাজনিত স্ট্রেন এবং পিঠে ব্যথা সৃষ্টিকারী টানগুলির জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
- হাঁটুর নিচে বালিশ দিয়ে ঘুমান: উপুড় হয়ে বা চিৎ হয়ে ঘুমালে আপনার মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে। ঘুমের সময় আপনার পা সামান্য উঁচু করে রাখলে পিঠের এই চাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাই হাঁটুর নিচে বালিশ দিয়ে আপনি আপনার পিঠের উপর চাপ অর্ধেক কমে ফেলতে পারেন।
Fact source : https://corona.gov.bd
